নিজস্ব প্রতিবেদক।।অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক আলোচনা ও নাগরিক পরিসরে তার সরকারের সমালোচনা করলেই সেটিকে “আওয়ামী লীগপন্থী অবস্থান” হিসেবে আখ্যা দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।বিশ্লেষকেরা বলছেন,এ ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ গণতান্ত্রিক বিতর্ক ও জবাবদিহিতার পরিবেশকে সংকুচিত করছে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ড. ইউনূসের প্রশাসনের বিরুদ্ধে শিশু স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা,মানবাধিকার,অর্থনীতি,আন্তর্জাতিক চুক্তি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নানা অভিযোগ আনা হয়। পোস্টটি ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
“সমালোচনা করলেই ট্যাগ”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের সমালোচনা করা নাগরিক অধিকার।তবে বর্তমানে দেশে এমন এক বিভাজন তৈরি হয়েছে,যেখানে সরকারের সমালোচনাকে সরাসরি একটি রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কোনো সরকারের জবাবদিহিতা দাবি করা মানেই অন্য কোনো দলকে সমর্থন করা নয়। গণতন্ত্রে সমালোচনা ও প্রশ্ন তোলার জায়গা সংকুচিত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর।”
শিশু স্বাস্থ্য ও টিকাদান নিয়ে প্রশ্ন
ভাইরাল পোস্টে শিশুদের হাম (Measles) টিকা কেনা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়,আন্তর্জাতিক সংস্থার সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।টিকা সংকট বা বিলম্ব হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (UNCRC) স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়ায় শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার মধ্যেও পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা ও মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ
সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত পোস্টে দেশে মব সহিংসতা, রাজনৈতিক হামলা,আদালত প্রাঙ্গণে হেনস্তা,শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর আক্রমণ এবং সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগও তুলে ধরা হয়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন,কোনো পরিস্থিতিতেই “মব জাস্টিস” গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।রাষ্ট্র যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ঠেকাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইনের শাসনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে নাগরিকের আইনি সুরক্ষা ও জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের কথিত একটি চুক্তি নিয়েও পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।যদিও ওই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি,তবু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন,যেকোনো বড় আন্তর্জাতিক সমঝোতা স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া উচিত।
তাদের মতে, জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত না হলে এমন চুক্তি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়তেই পারে।
অর্থনীতি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি
দেশে শিল্পকারখানায় হামলা,লুটপাট, শ্রমিক অসন্তোষ ও বিনিয়োগ স্থবিরতার বিষয়ও পোস্টটিতে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন,রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শ্রমিকেরা।
একজন ব্যবসায়ী নেতা বলেন,“বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন দেখতে চান।যখন মব সহিংসতার খবর আসে, তখন আস্থা কমে যায়।”
রাজনৈতিক সহনশীলতার সংকট
বিশ্লেষকদের মতে,বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট হয়ে উঠেছে সহনশীলতার অভাব।একপক্ষ অন্যপক্ষকে পুরোপুরি ‘দেশবিরোধী’ বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে চিত্রিত করছে।
তাঁরা বলছেন,গণতন্ত্র টিকে থাকে প্রশ্ন, সমালোচনা ও মতভিন্নতার মধ্য দিয়েই।সমালোচনার জবাব যদি তথ্য ও নীতিগত ব্যাখ্যার বদলে রাজনৈতিক আক্রমণে দেওয়া হয়, তাহলে তা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অশনিসংকেত।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.