মাজহারুল ইসলাম।।সাংবাদিকতা একটি মহান ও দায়িত্বশীল পেশা। সত্য তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং সমাজের সামনে বাস্তবতা প্রকাশ করাই একজন সাংবাদিকের প্রধান কাজ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—আজ সাংবাদিক সমাজের ভেতরেই এক ধরনের বৈষম্য, অহংকার ও অসহযোগিতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা এই পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রায়ই দেখা যায়, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কিছু সাংবাদিক প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকদের অবজ্ঞা করেন। বুম ধরতে গেলে ধমক, সামনে দাঁড়াতে না দেওয়া, অপমানজনক আচরণ—এসব যেন অনেকের কাছে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এমন আচরণ শুধু অনৈতিক নয়, এটি সাংবাদিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্যকেও দুর্বল করে দিচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে—একজন সাংবাদিক কি আরেকজন সাংবাদিকের প্রতিপক্ষ? অবশ্যই নয়। বরং এই পেশায় একে অপরের সহযোগী ও সহযোদ্ধা হওয়ার কথা। কারণ সংবাদ সংগ্রহের বাস্তবতা কঠিন। কখনও রাজনৈতিক হামলা, কখনও সন্ত্রাসী হুমকি, কখনও প্রশাসনিক চাপ—সবকিছু মোকাবিলা করেই সাংবাদিকদের কাজ করতে হয়। সেখানে নিজেদের মধ্যেই বিভেদ তৈরি হলে পুরো সাংবাদিক সমাজ দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরও বড় সত্য হলো—আজ যারা সিনিয়র, তারাও একদিন নতুন ছিলেন। তারাও ভুল করেছেন, ধাক্কা খেয়েছেন, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শিখেছেন। কেউ সুযোগ না দিলে তারা আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারতেন না। তাহলে এখন কেন নতুনদের জন্য দরজা বন্ধ করা হবে? কেন তাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে না?
একজন নতুন সাংবাদিককে সামনে দাঁড়াতে দেওয়া, মাইক ধরতে দেওয়া, ভুল করলে তা শুধরে দেওয়া—এসবই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। ধমক দিয়ে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং হাতে ধরে শেখানোই একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিকের দায়িত্ব। কারণ আজকের নতুনরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেবে। তাদের দক্ষ করে তোলা মানে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা।
এটিও মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকদের ঐক্য দুর্বল হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় অপরাধীরা। যখন তারা দেখে সাংবাদিকরা নিজেরাই বিভক্ত, তখন হামলা, হুমকি ও নির্যাতনের সাহস আরও বেড়ে যায়। অথচ ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিগত আধিপত্যের জায়গা নয়। এটি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, দায়িত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের জায়গা। তাই এখনই সময়—অহংকার ও বৈষম্যের সংস্কৃতি পরিহার করে সহযোগিতা ও সম্মানের পরিবেশ গড়ে তোলার। নতুনদের সুযোগ দিতে হবে, শেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে এবং সাংবাদিক সমাজকে একটি শক্তিশালী পরিবারে পরিণত করতে হবে।
কারণ একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানবিকতা, অহংকার নয়।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
