চাঁদপুর প্রতিনিধি।।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া “বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় ১১ বছরের ভাই বাবার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে ধর্ষণকারীকে গুলি করে হত্যা করেছে”—এমন দাবি সম্পূর্ণ ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর বলে নিশ্চিত করেছে অনুসন্ধান।
গত ১৭ এপ্রিল ‘চ্যানেল ইউরোপ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে এ–সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়,চাঁদপুর জেলার মতলব থানার “রইচাপুর ইউনিয়নে” বোনকে ধর্ষণের পর অভিযুক্তকে গুলি করে হত্যা করে ১১ বছরের শিশু সাফওয়ান।পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে।১৯ লাখ ফলোয়ার থাকা পেজটির ওই ভিডিও ৭৭ লাখের বেশি বার দেখা হয়।এছাড়া বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর একই দাবি ছড়িয়ে দেয়।
পুরোনো ভিডিও ও ভিন্ন ঘটনার ছবি ব্যবহার
অনুসন্ধানে দেখা যায়,ভাইরাল ভিডিওতে ব্যবহৃত জনতার জটলার দৃশ্যটি ২০১৮ সালের একটি ইউটিউব ভিডিও থেকে নেওয়া। “শিলন আহমেদ ব্লগ” নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশিত সেই ভিডিওর শিরোনাম ছিল—“তিন পায়ে হাঁটা দেখলে আপনিও অবাক হয়ে যাবেন, ইকো পার্ক, গাংনী, মেহেরপুর।” অর্থাৎ ভাইরাল দাবির সঙ্গে ভিডিওটির কোনো সম্পর্ক নেই।
এছাড়া ফটোকার্ডে ব্যবহৃত হাতকড়া পরা শিশুর ছবিটিও ভিন্ন ঘটনার। যাচাই করে দেখা যায়,এটি ঢাকার খিলগাঁও এলাকার একটি পুরোনো ভিডিও থেকে নেওয়া,যেখানে মাদকাসক্তির অভিযোগে এক শিশুকে গ্রেপ্তারের ঘটনা তুলে ধরা হয়েছিল। চ্যানেল আই ও বার্তা২৪–এর ফেসবুক পেজেও সেই ভিডিও পাওয়া যায়।
চাঁদপুরে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি
চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, জেলার কোথাও এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।এটি সম্পূর্ণ “ফেক নিউজ”।
ভাইরালের পেছনে ‘ট্রেন্ড’ অনুসরণ
এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজন কনটেন্ট নির্মাতা স্বীকার করেছেন, যাচাই না করেই তারা ভাইরাল পোস্ট দেখে নিজেদের কনটেন্ট তৈরি করেছেন।
“লিটন টেক বিডি ওয়ান” নামের একটি পেজ এআই দিয়ে ভিডিও বানিয়ে প্রচার করে।পরে সত্যতা না থাকায় সেটি সরিয়ে ফেলা হয়। পেজটির পরিচালক লিটন আলী বলেন, বড় বড় পেজে খবরটি দেখে তিনি সেটিকে সত্য ভেবেছিলেন।
আরেক কনটেন্ট নির্মাতা নাজমুল হাসান বলেন, একাধিক ফেসবুক পেজে একই দাবি দেখেই তিনি ভিডিও তৈরি করেন।
বিশেষজ্ঞদের মত
রিউমর স্ক্যানারের সিনিয়র ফ্যাক্টচেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন,আবেগপ্রবণ ও সহিংস গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হয়,কারণ অনেকেই তথ্য যাচাইয়ের চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদ আল-জামান বলেন, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্ম জনপ্রিয় কনটেন্টকে বেশি ছড়িয়ে দেয়, সত্য-মিথ্যা যাচাইকে নয়। ফলে বিভ্রান্তিকর কনটেন্টও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং নির্মাতারা ভিউ ও অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে উৎসাহিত হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাচাইহীন ও ভুয়া তথ্য ছড়ানোর এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করছে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
