নিজস্ব প্রতিবেদক।।দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান।কিন্তু ১/১১-এর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং দেশত্যাগের পেছনের অজানা অধ্যায় নিয়ে জনমনে কৌতূহলের শেষ ছিল না।সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সেই সময়ের ভয়াবহ ও অমানবিক নির্যাতনের নানা তথ্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়,২০০৭ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মইনুল রোডের বাসভবন থেকে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।অভিযোগ রয়েছে,ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে কর্নেল (অব.) ইমরান তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আটক করে ডিজিএফআই পরিচালিত জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি)-এ নিয়ে যান।
প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়,সেনা সদর দপ্তরে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিনের উপস্থিতিতে তারেক রহমানকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
মেজর ইমরানের বর্ণনা অনুযায়ী,একজন রানার ও একজন ড্রাইভারসহ তিনি খালেদা জিয়ার বাসভবনে যান।কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর তারেক রহমান বাসা থেকে বের হলে তাকে গাড়িতে তোলা হয়।কিছুদূর যাওয়ার পর তার মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেয়া হয়।তিনি জানালা খোলার অনুরোধ করলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
এরপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতনের অধ্যায়।অনুসন্ধানে বলা হয়েছে,জেআইসিতে তাকে কয়েকদিন আটকে রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বেঁধে রাখা হয়।হাত বেঁধে ঝুলিয়ে নির্যাতনের অভিযোগও উঠে এসেছে।দীর্ঘ সময় ধরে চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সিটিআইবি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্নেল জিএস লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের নির্দেশে কর্মকর্তারা তারেক রহমানকে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরে আবারও কয়েকদিন ধরে তাকে জেআইসিতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আব্দুর রব খানের জবানবন্দির বরাতে বলা হয়েছে,তারেক রহমানের কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়েছিল,যেখানে তিনি জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন পদস্থ সেনা কর্মকর্তা।তাদের মধ্যে ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার,লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) জাহিদ হোসেন ও মেজর (অব.) মনির।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে,নির্যাতনের ফলে তারেক রহমান গুরুতর শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।এক পর্যায়ে তাকে সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ারেন্ট অফিসার ফজলুর জবানবন্দি অনুযায়ী,ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিন নির্দেশ দিয়েছিলেন “পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত অবস্থায় রাখতে।”
এক পর্যায়ে সিলিং থেকে পড়ে গিয়ে তার কোমরে গুরুতর আঘাত লাগে বলে জানা যায়।পরে দীর্ঘ সময় তাকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।
তৎকালীন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী জবানবন্দিতে দাবি করেন,তিনি নির্যাতনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।তবে ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে তারেক রহমানের নানির মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার সময় তিনি দেখেন,তারেক রহমান খুঁড়িয়ে হাঁটছেন।পরে পারিবারিক সূত্রে তিনি জানতে পারেন,ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের নির্যাতনের কারণেই তার এমন শারীরিক অবস্থা হয়েছে।
এ নিয়ে সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার বাগ্বিতণ্ডাও হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
অনুসন্ধানে সাতজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে, যারা ওই সময়ের জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।তারা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন,ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার,লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আফজাল নাছের চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আব্দুর রব খান,লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. ফরিদ উদ্দিন এবং মেজর (অব.) মনির।
উল্লেখ্য,২০০৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর তারেক রহমানকে একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।এরপর দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
