নিজস্ব প্রতিবেদক।।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের দেওয়া বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।গত ২৫ আগস্ট তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টার সাথে বৈঠক শেষে আলেকজান্ডার ম্যানটিটস্কি যে ভাষায় ৫ বিলিয়ন ডলার আত্মসাতের অভিযোগকে ‘মিথ্যা গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন,তা একদিকে যেমন সাবেক সরকারের জন্য স্বস্তির, অন্যদিকে এটি গভীরতর কিছু প্রশ্নও উত্থাপন করে।
রুশ রাষ্ট্রদূতের যুক্তির ব্যবচ্ছেদ
রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের মূল যুক্তি ছিল অঙ্ক এবং প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে:
- অংকের বিশালতা: ৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা) কোনো ছোট অংক নয়। রাষ্ট্রদূত প্রশ্ন তুলেছেন,একটি প্রকল্পের নির্মাণ চলাকালীন এত বিশাল অংকের টাকা কীভাবে কাউকে দেওয়া সম্ভব? তাঁর মতে,রাশিয়া ‘অযৌক্তিক’ কোনো লেনদেন করেনি।
- রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: তিনি অভিযোগটিকে ২০২৩ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছড়ানো প্রোপাগান্ডা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
রুশ রাষ্ট্রদূত এবং রোসাটম তাদের প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা রক্ষায় এই অভিযোগ অস্বীকার করাটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি কেবল ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ আছে কি না,তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে:
১. স্বাধীন তদন্তের প্রয়োজনীয়তা
একটি মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার নিরসন কেবল সংশ্লিষ্ট দেশ বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মৌখিক বিবৃতিতে হওয়া সম্ভব নয়।রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন,কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বা স্বাধীন কোনো অডিট সংস্থা দিয়ে এই বিশাল ব্যয়ের প্রকল্পটির চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া জরুরি।
২. ‘মেগা প্রজেক্ট-মেগা দুর্নীতি’র ভীতি
আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরের শাসনামলে অসংখ্য মেগা প্রকল্পের ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার উদাহরণ রয়েছে।রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা)। সমালোচকদের মতে,ব্যয়ের এই বিশালত্বের মধ্যেই দুর্নীতির সুযোগ লুকিয়ে থাকতে পারে।রাষ্ট্রদূত যে ৫ বিলিয়ন ডলারের কথা বলেছেন,তা যদি সরাসরি লেনদেন না-ও হয়, তবে প্রকল্পের সরঞ্জামের দাম বাড়িয়ে দেখানো বা মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশনের মাধ্যমেও অর্থ পাচার হতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা
রাশিয়া বর্তমানে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে এবং রূপপুর প্রকল্প তাদের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ।ফলে প্রকল্পের সুনাম রক্ষা করা রাশিয়ার জন্য বাধ্যতামূলক।রাষ্ট্রদূতের এই কড়া প্রতিবাদ কেবল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পক্ষ নেওয়া নয়,বরং রাশিয়ার নিজস্ব ব্যবসায়িক ভাবমূর্তি রক্ষার প্রচেষ্টাও হতে পারে।
উপসংহার: ইতিহাসের কাঠগড়ায় উন্নয়ন
শেখ হাসিনার শাসনামলে রূপপুর প্রকল্পটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন,যা বাংলাদেশকে পরমাণু ক্লাবের সদস্য করেছে।তবে ‘উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি’র এই দ্বন্দ্বে সত্য উদ্ঘাটন করা এখন বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্ব।রুশ রাষ্ট্রদূত বিষয়টিকে ‘মিথ্যা’ বললেও, বাংলাদেশের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হলে একটি নিরপেক্ষ ও কারিগরি তদন্তের বিকল্প নেই।কেবল তখনই প্রমাণিত হবে—এটি কি সত্যিই কোনো ‘অশুভ মহলের অপপ্রচার’ ছিল, নাকি দেশের ইতিহাসের বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারি।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
