নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ইতিহাসে প্রতিটি সরকারের প্রথম কয়েক মাস ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল।আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের জগদ্দল পাথর সরালেও,অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিশৃঙ্খলা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের চ্যালেঞ্জিং সূচনার তুলনামূলক চিত্রটি নিচেই বিশ্লেষণ করা হলো।
১. আওয়ামী লীগ আমল: অপরাধের রাজনৈতিক ঢাল (২০০৯-২০২৪)
২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের অপরাধ দমনের নীতি ছিল চরম পক্ষপাতদুষ্ট।
- পরিসংখ্যানের আড়ালে: তাদের প্রথম কয়েক বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ‘নিখোঁজ’ হওয়ার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
- দখলদারিত্ব: রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে ভূমি দখল, বালুমহাল ও জলাশয় নিয়ন্ত্রণ এবং টেন্ডারবাজি ছিল ওপেন সিক্রেট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্যানুযায়ী, ১৫ বছরের এই শৃঙ্খল সাধারণ মানুষের জীবন বিষিয়ে তুলেছিল।
- ফলাফল: অপরাধ কমেনি, বরং অপরাধীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশ হয়ে উঠেছিল।
২. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: বিশৃঙ্খলার মহোৎসব (২০২৪-এর শেষার্ধ)
৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম কয়েক মাস ছিল আইনশৃঙ্খলার দিক থেকে সবচাইতে নাজুক সময়।
- আইনহীনতার নগ্ন রূপ: পুলিশ বাহিনী কর্মবিরতিতে থাকায় এবং থানাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় দেশে কোনো অভিভাবক ছিল না।
- মব জাস্টিস: এই সময়ে গণপিটুনি, মাজার ভাঙচুর এবং ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জেরে অগুনতি হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, যার সঠিক পরিসংখ্যান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অপরাধীরা এই শাসনহীনতার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছিল।
৩. বর্তমান বিএনপি সরকার: ১৭ ফেব্রুয়ারির পর থেকে (বর্তমান)
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত অপরাধের একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
কঠোর সমালোচনা: যেখানে ব্যর্থতা স্পষ্ট
গত কয়েক মাসে ৪৬৪টি হত্যা এবং ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলার পরিসংখ্যান অত্যন্ত ভয়াবহ।
- উদ্বেগ: একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সূচনালগ্নে এত বিপুল সংখ্যক ধর্ষণ মামলা ইঙ্গিত দেয় যে, তৃণমূল পর্যায়ে অপরাধীদের মনে আইনের ভয় এখনো সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
- জামিনের ফাঁকফোকর: হত্যা ও ধর্ষণ মামলার আসামিদের একটি বড় অংশের (যেমন ৭১ জন ধর্ষণ মামলার আসামি) দ্রুত জামিন পাওয়াটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তের দুর্বলতা নাকি আইনি ব্যবস্থার ছিদ্র, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। সরকার যদি দ্রুত চার্জশিট দাখিলের দাবি করে, তবে এত দ্রুত আসামিরা জামিন পাচ্ছে কীভাবে?
ইতিবাচক দিক: যেখানে সফলতার আভাস
এতসব চ্যালেঞ্জের মাঝেও বর্তমান সরকারের কিছু পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে:
- জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন: অতীতের মতো অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে রক্ষার প্রবণতা এবার তুলনামূলক কম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, অনেক বড় বড় অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যা বিগত ১৫ বছরে কল্পনাতীত ছিল।
- চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের রাশ: ফ্যাসিস্ট আমলের সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দেওয়ায় এবং দ্রুত গ্রেপ্তার অভিযান চালানোয় ভূমি দখল ও টেন্ডারবাজি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
- পুলিশি সংস্কার: জনবল সংকট মেটাতে ১৪,৫০০ নতুন পদ সৃষ্টি এবং সরাসরি নিয়োগের উদ্যোগ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ, যা স্থবির হয়ে পড়া পুলিশ বাহিনীকে সচল করবে।
বিশ্লেষণাত্মক রায়
”আওয়ামী লীগের ছিল অপরাধের লালন, অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল অপরাধের বিশৃঙ্খলা, আর বর্তমান সরকারের ওপর দায়িত্ব হলো অপরাধের নির্মূল।”
উপসংহার:
বর্তমান সরকারের আমলে অপরাধের সংখ্যা (বিশেষ করে খুন ও ধর্ষণ) যদি আগের তুলনায় বাড়ে, তবে তা হবে সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং এটি প্রমাণ করবে যে তারা এখনো মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ হারানো অবস্থায় আছে। আর যদি এই কঠোর পদক্ষেপ ও নতুন নিয়োগের ফলে এই গ্রাফ নিচের দিকে নামে, তবেই বোঝা যাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কেবল কাগজের বাঘ নয়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ অতীতের দুঃশাসনের চেয়ে বর্তমানের নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
