নিজস্ব প্রতিবেদক।।গাজীপুরে মাদ্রাসাছাত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি এখন আর সাধারণ কোনো নিখোঁজ সংবাদ নেই; বরং এটি আমাদের ঘুণে ধরা আইনি কাঠামো,সামাজিক অবক্ষয় এবং কিছু মানুষের সিলেক্টিভ নৈতিকতার এক নগ্ন দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ত্রের মুখে ঘর ভেঙে মেয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা আর ‘প্রেমের দোহাই’ দিয়ে অপরাধ ঢাকার অপচেষ্টা—সব মিলিয়ে এক অস্থির সময়ের চিত্র ফুটে উঠেছে।
১. অপহরণ বনাম সম্মতি: আইনের দৃষ্টিতে বাস্তবতা
বাংলাদেশের প্রচলিত “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)”অনুযায়ী,কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে তার অভিভাবকের অমতে বা প্রলোভন দেখিয়ে সরিয়ে নেওয়া হলে তা সরাসরি অপহরণের পর্যায়ে পড়ে।
পেশিশক্তির ব্যবহার:অভিযুক্ত পক্ষ যদি বিয়ের দাবিও করে,তবে প্রশ্ন ওঠে—অস্ত্রের মুখে কেন? আইনের শাসন বিদ্যমান থাকলে বিয়ের জন্য ঘর ভাঙা বা সন্ত্রাসী কায়দায় মেয়ে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই বৈধতা পেতে পারে না।
জোরপূর্বক স্বাক্ষর:অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া তথাকথিত ‘নিকাহনামা’ বা খসড়া দলিলের আইনি ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে।যদি ভয় দেখিয়ে বা জবরদস্তিমূলকভাবে স্বাক্ষর নেওয়া হয়,তবে সেটি দণ্ডবিধির অধীনে জালিয়াতি এবং বলপ্রয়োগের অপরাধ।
২. বাল্যবিবাহ ও সাংবিধানিক অধিকার
বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ এবং ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।অথচ এই ঘটনায় মেয়েটি যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে,তবে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী এই বিয়ে কেবল অবৈধই নয়,বরং দণ্ডনীয় অপরাধ।
“বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি।যদি প্রেমের নামে কোনো নাবালিকাকে প্ররোচিত করে বিয়ে করা হয়,
তবে তা আইনের চোখে বৈধতা পায় না।বরং এটি শিশুর প্রতি সহিংসতা ও তার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।”
৩. নারীবাদী ও প্রগতিশীলদের ‘সুবিধাবাদী’ নীরবতা
এই ঘটনার সবচেয়ে হতাশাজনক দিক হলো তথাকথিত নারীবাদী মহলের দ্বিচারিতা।যখন সেলিব্রেটি বা পরিচিত মুখদের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম ঘটে,তখন যারা রাজপথ কাঁপান,তারাই আজ গাজীপুরের এই মাদ্রাসাছাত্রীর বেলায় নিশ্চুপ।এই **’সিলেক্টিভ এক্টিভিজম’** প্রমাণ করে যে,এ দেশে নারী সুরক্ষা কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে।অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সুরক্ষা কি কেবল তার সামাজিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করবে?
৪. রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনের দায়বদ্ধতা
রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া।কিন্তু ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মেয়েটিকে উদ্ধার করতে না পারা প্রশাসনের সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দি:মেয়েটির জবানবন্দি না নেওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষের দাবিকেই সত্য বলে মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তদন্তের নিরপেক্ষতা:রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের প্রভাবে যেন তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আবশ্যিক দায়িত্ব।
৫. সামাজিক অবক্ষয় ও কিশোর অপরাধের দাপট
কেন মেধাবী ছাত্রীরা বখাটে বা অপরাধপ্রবণ ছেলেদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে,তা সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং পারিবারিক নজরদারির অভাব এই অরাজকতাকে উসকে দিচ্ছে।যখন অপরাধীরা মনে করে ‘প্রেমের বিয়ে’র নাম দিয়ে অপহরণের দায় এড়ানো সম্ভব, তখনই আইনের শাসনের অবক্ষয় ঘটে।
উপসংহার ও আইনি পর্যবেক্ষণ
গাজীপুরের এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে,বিচারহীনতার সংস্কৃতি কীভাবে অপরাধীদের সাহসী করে তোলে।এটি যদি অপহরণ হয়,তবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। আর যদি এটি তথাকথিত প্রেমের বিয়েও হয়,তবে অপ্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে আইনের ব্যত্যয় ঘটানোর জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
ফেসবুক লাইভ বা ইন্টারনেটে সাফাই গেয়ে অপরাধ আড়াল করার সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেক পরিবার ধ্বংস হবে।আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে এমন ‘গাজীপুর ট্র্যাজেডি’র পুনরাবৃত্তি রুখতে।
মনে রাখবেন:কোনো তথাকথিত ‘প্রেম’ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কোনো অপরাধই ‘সম্মতি’র দোহাই দিয়ে ঢাকা সম্ভব নয় যদি সেখানে আইনি বৈধতা ও মানবিক মূল্যবোধ অনুপস্থিত থাকে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
