নিজস্ব প্রতিবেদক।।২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে প্রণীত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নে গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।যদিও সরকার একে ‘জনরায়ের প্রতিফলন’ বলছে,তবে বিশ্লেষক এবং সমালোচকদের মতে,এই গণভোট দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে নতুন বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এক গভীর সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
অর্থনৈতিক বোঝা: সংস্কারের নামে হাজার কোটির বিলাসিতা?
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এই গণভোট আয়োজনকে অনেকেই ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখছেন।
বিপুল ব্যয়:জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট মিলিয়ে মোট ৩,১৫০ কোটি টাকাঅনুমোদন করা হয়েছে।যার মধ্যে শুধুমাত্র গণভোটের জন্যই অতিরিক্ত ৮৭৪কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি:আগের নির্ধারিত ২,০৮০ কোটি টাকার বাজেটের চেয়ে নির্বাচনী ব্যয় প্রায় **৫১.৪৪ শতাংশ** বৃদ্ধি পাওয়াকে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আইনশৃঙ্খলা খাতের অপচয়:১,৪০০ কোটি টাকা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যয় করা হলেও দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বা নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে এই অর্থের ব্যবহার হতে পারতো বলে সাধারণ মানুষের দাবি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট: একতরফা সংস্কারের অভিযোগ
জুলাই সনদকে ‘ঐকমত্যের দলিল’ বলা হলেও অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।
সংবিধান সংস্কারের ধরণ:প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও মেয়াদ (১০ বছর বা ২ মেয়াদ) সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাব ইতিবাচক হলেও,তা গণভোটের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না,তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
আইনি বৈধতার প্রশ্ন:রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে গণভোট আয়োজনের আইনি ভিত্তি নিয়ে হাইকোর্টে রুল জারি করা হয়েছিল।বিচারবিভাগে বিষয়টি বিচারাধীন থাকাবস্থায় তড়িঘড়ি করে ভোট গ্রহণ সরকারের কর্তৃত্ববাদী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।
জুলাই সনদের মূল বৈশিষ্ট্য ও জনরায়
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটে ৬৮.৫৯% ভোটার “হ্যাঁ” বলে সনদটি অনুমোদন করেছেন।এই সনদের উল্লেখযোগ্য সংস্কারগুলো হলো:
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য।
বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা।
দলীয়করণমুক্ত পুলিশ ও প্রশাসন ব্যবস্থা।
কঠোর বিশ্লেষণ: দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র নাকি অনিশ্চয়তা?
সমালোচকদের মতে,অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের নামে এমন এক ‘হাইব্রিড’ ব্যবস্থা তৈরি করছে যা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বড় অংশ এই সনদে স্বাক্ষর করলেও অনেক দলই অন্তরালে এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।বিশেষ করে, ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ২৫টি রাজনৈতিক দলের স্বাক্ষরিত এই সনদকে ‘জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ফর্মুলা’ হিসেবে দেখছেন বিরোধীরা।
পর্যবেক্ষণ:
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার ‘ফ্যাসিবাদ রোধে’ রক্ষাকবচ তৈরির দাবি করলেও,হাজার কোটি টাকার এই গণভোট মূলত অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রান্তে থাকা রাষ্ট্রের জন্য একটি ব্যয়বহুল পরীক্ষা। সংস্কারের সুফল যদি তৃণমূল পর্যায়ে না পৌঁছায়, তবে এই ‘জুলাই সনদ’ কেবল কাগজের দলিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
**তথ্যসূত্র:** উইকিপিডিয়া, নিউ এজ এবং বাংলাদেশ গেজেট (২০২৫-২৬)।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
