আইন-আদালত ডেস্ক।।চেক ডিসঅনার মামলা মানেই আসামির অবধারিত জেল—এমন দিন এখন শেষ হতে চলেছে।বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একাধিক রায়ের পর্যবেক্ষণে এটি স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র চেকের পাতায় স্বাক্ষর থাকলেই কাউকে সাজা দেওয়া যাবে না।সাজা নিশ্চিত করতে হলে বাদীকে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে,চেকটি কোনো বৈধ ঋণ বা দায় (Legal Debt or Liability) পরিশোধের বিপরীতে ইস্যু করা হয়েছিল।
উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ: মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিকের বিশ্লেষণে উঠে আসা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য:
কনসিডারেশন বা প্রতিদান বাধ্যতামূলক:
এন.আই অ্যাক্টের ৯ ও ৪৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো চেক যদি বৈধ দেনা-পাওনা বা প্রতিদান (Consideration) ছাড়া ইস্যু করা হয়, তবে তা অকার্যকর হিসেবে গণ্য হবে।লোকমান বনাম আইয়ুব আলী’ (৩৮ বিএলডি) মামলায় হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন যে,বাদী যদি চেক প্রাপ্তির বিপরীতে কোনো লেনদেনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন এবং আসামি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে কোনো বৈধ দেনা ছিল না,তবে আসামি খালাস পাবেন।
হোল্ডার-ইন-ডিউ কোর্স:
আদালত দেখছেন বাদী কি সত্যিই আইনসংগতভাবে চেকটির মালিক হয়েছেন, নাকি এটি চুরি, জালিয়াতি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে।
স্বাক্ষর ও হাতের লেখায় ভিন্নতা:
এন.আই অ্যাক্টের ৩(ই) ধারা এবং ৫৬ ডিএলআর ৬৩৬-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী,যদি চেকের স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং প্রাপকের নাম ভিন্ন ভিন্ন হাতের লেখা হয়, তবে তাকে আইনানুগভাবে ‘ইস্যুয়েন্স অব চেক’ বলা কঠিন।
কেন এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ?
১.ফাঁকা চেকের অপব্যবহার রোধ:অনেক ক্ষেত্রে পাওনাদার বা দাদন ব্যবসায়ীরা ‘সিকিউরিটি’ হিসেবে রাখা ব্ল্যাঙ্ক চেক ব্যবহার করে কয়েকগুণ বেশি টাকার মামলা ঠুকে দেন।আদালতের এই কঠোর অবস্থানের ফলে এ ধরনের হয়রানি কমবে।
২.প্রমাণের দায়ভার:২৬ বিএলসি (২০২১)মামলার রায় অনুযায়ী,রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে যে চেক প্রদানের সময় বিনিময় (Exchange) সম্পন্ন হয়েছে। এই প্রমাণে ব্যর্থ হলে আসামি নির্দোষ প্রমাণিত হবেন।
৩. বিচারের গভীরতা:আদালত এখন শুধু চেকের বাহ্যিক সত্যতা (যেমন সিগনেচার মিল আছে কি না) দেখছেন না,বরং লেনদেনের ন্যায্যতাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিবেচনা করছেন।
আইনজীবীদের অভিমত
বিশেষজ্ঞদের মতে,এই আইনি ব্যাখ্যাগুলো সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।এর ফলে জালিয়াতি বা ব্ল্যাঙ্ক চেকে টাকা বসিয়ে কাউকে ফাঁসানোর সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে।এখন থেকে চেকে স্বাক্ষর থাকলেও আদালত বিচার করবেন—কেন এবং কোন প্রেক্ষাপটে চেকটি দেওয়া হয়েছিল।
সতর্কতা:চেক ডিসঅনার মামলা একটি জটিল আইনি প্রক্রিয়া।আপনার কাছে থাকা চেকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং জালিয়াতি এড়াতে যেকোনো লেনদেনের লিখিত দলিল রাখা এখন আগের চেয়েও বেশি জরুরি।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.