নিজস্ব প্রতিবেদক।।একটি দেশের আইনসভা বা সংসদ হলো গণতন্ত্রের হূৎপিণ্ড।কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদের প্রতিটি মিনিটের ব্যয় যখন ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকেছে,তখন এই বিশাল অংকের সার্থকতা নিয়ে উঠছে কঠোর প্রশ্ন।যেখানে সাধারণ মানুষ এক কেজি চাল বা এক লিটার ভোজ্যতেলের দাম নিয়ে দিশেহারা,সেখানে সংসদের এই ‘রাজকীয়’ ব্যয়ভার কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতার প্রদর্শনী?
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: ঘাম ঝরানো টাকার অপচয়?
অর্থনীতিবিদদের মতে,সংসদের এই বিশাল ব্যয় নির্বাহ হয় মূলত পরোক্ষ কর বা ভ্যাট (VAT) থেকে,যা রিকশাচালক থেকে শুরু করে দিনমজুর—সবাইকে দিতে হয়।
ব্যয়ের বোঝা: মাসে ২৫২ কোটি টাকা খরচ করে সংসদ যখন চলে,তখন প্রত্যাশা থাকে সেখানে এমন নীতিমালা তৈরি হবে যা সাধারণ মানুষের পকেট বাঁচাবে।
উৎপাদনশীলতার অভাব: যদি ৮ ঘণ্টার অধিবেশনে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইনের চেয়ে রাজনৈতিক বন্দনা বেশি হয়,তবে একে অর্থনৈতিক ভাষায় ‘ডেড-ওয়েট লস’ (Dead-weight loss) বা অনুৎপাদনশীল ব্যয় হিসেবে গণ্য করা যায়।
রাজনৈতিক বাস্তবতা: বিতর্কহীন আড্ডাখানা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,একটি কার্যকর সংসদের প্রাণ হলো ‘তীব্র বিতর্ক’ এবং ‘জবাবদিহিতা’। কিন্তু বর্তমানে সংসদের ভেতরের চিত্রটি ভিন্ন:
একপাক্ষিক স্তুতি: গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংকটের সময় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অধিবেশন কক্ষ ভরে থাকে তোষামোদি আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ভাষণে।
সংকটের পাশ কাটানো: বোরো মৌসুমে সেচ সংকট, লোডশেডিং কিংবা সিন্ডিকেটের কারণে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো বিষয়গুলো যখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা,তখন সংসদীয় কমিটিগুলোর স্থবিরতা রাজনৈতিক ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
আইন পাসের তাড়াহুড়ো: জনগণের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে এমন অনেক স্পর্শকাতর বিল কোনো প্রকার গভীর যাচাই-বাছাই বা গণশুনানি ছাড়াই পাস হয়ে যাচ্ছে,যা সংসদের মৌলিক চরিত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
জনগণের কাঠগড়ায় জনপ্রতিনিধিরা
সংসদ সদস্যদের (MP) প্রধান কাজ আইন প্রণয়ন এবং সরকারের ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো,মিনিটের পর মিনিট জনগণের লাখ লাখ টাকা খরচ করে তারা যখন ব্যক্তিগত স্বার্থ বা দলীয় এজেন্ডা নিয়ে মত্ত থাকেন,তখন তা সাধারণ মানুষের সাথে এক ধরণের পরিহাসে পরিণত হয়।
পর্যবেক্ষণ: ১,৭৫,০০০ টাকা প্রতি মিনিটে খরচ হওয়া মানে হলো—এক ঘণ্টার অধিবেশনে যে টাকা ব্যয় হয় (১.০৫ কোটি টাকা),তা দিয়ে অন্তত কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষকের সার ও বীজের ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব ছিল।
উপসংহার
সংসদকে কেবল ‘আইন পাসের রাবার স্ট্যাম্প’ বা ‘রাজনৈতিক শোপিস’ হিসেবে ব্যবহার করার বিলাসিতা দেখানোর সময় এখন নেই।অর্থনৈতিক সংকটের এই সন্ধিক্ষণে প্রতিটি পয়সার হিসাব দিতে হবে।যদি সংসদ সাধারণ মানুষের ডাল-ভাতের সংস্থান নিশ্চিত করতে না পারে,তবে এই ‘পৌনে ২ লাখ টাকার মিনিট’ ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি খরুচে আড্ডার কলঙ্ক হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.