মাজহারুল ইসলাম।।বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বর্তমান সময়টি সম্ভবত সবচেয়ে সংকটময় এবং বৈপরীত্যে ঠাসা।গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ঋণের সংস্কৃতি এখন আর কেবল উন্নয়নের জ্বালানি নয়,বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের হালনাগাদ তথ্য যে চিত্র তুলে ধরছে,তা যে কোনো সচেতন নাগরিকের জন্য শিউরে ওঠার মতো।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৪৩ দিনে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নিয়েছে—যার কোনোটিই কোনো নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নয়,বরং ব্যয় হচ্ছে বেতন-ভাতা ও নিয়মিত পরিচালন ব্যয় মেটাতে।
উন্নয়ন বনাম অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই:
গত ১৭ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,আওয়ামী লীগ আমলের (২০০৯-২০২৪) ঋণের একটি বড় অংশ ব্যয় হয়েছে পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরিতে।ঋণের পরিমাণ ১৮.৩৬ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছালেও সেখানে ‘সম্পদ সৃষ্টি’র একটি প্রয়াস ছিল।কিন্তু ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত যে ঋণের জোয়ার আমরা দেখছি,তা মূলত অনুৎপাদনশীল ঋণ।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ঋণের পরিমাণ ৪.৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়ানো এবং বর্তমান সরকারের প্রথম দেড় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক ঋণ নিয়ে নেওয়া প্রমাণ করে—রাষ্ট্রের নিজস্ব আয় বা রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
কাঠামোগত ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক দায়
একটি দেশ যখন তার কর্মকর্তাদের বেতন দিতে এবং জ্বালানি তেল আমদানির মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে ক্রমাগত ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তখন বুঝতে হবে অর্থনীতির ফুসফুস আর কাজ করছে না।
রাজস্ব ঘাটতি:
লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর আদায় না হওয়া এবং অর্থ পাচারের ফলে সৃষ্ট শূন্যতা এখন ব্যাংক ঋণ দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে।
ব্যক্তি খাতের সংকট:
সরকার যদি এভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়,তবে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঋণ পাবেন না।ফলে বিনিয়োগ কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হবে।
ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমান সরকারের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়,বরং একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও।মেগা প্রকল্পের দুর্নীতির সমালোচনা করে ক্ষমতায় এসে যদি পুনরায় ঋণের ওপর নির্ভর করেই রাষ্ট্র চালাতে হয়, তবে জনগণের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হবে। ফ্যামিলি কার্ড বা কৃষি ঋণ মওকুফের মতো জনতুষ্টিমূলক কর্মকাণ্ড প্রশংসনীয় হতে পারে, কিন্তু তা যদি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে দেউলিয়া করে দেয়, তবে তার ফল হবে ভয়াবহ।
আমাদের আহ্বান
এখন আর রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুড়ির সময় নেই।সরকারের উচিত হবে:
১.কৃচ্ছ্রসাধন:অপ্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ব্যয় এবং বিলাসিতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২.রাজস্ব সংস্কার:কর আদায়ের পদ্ধতি ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত করে অভ্যন্তরীণ আয় বাড়াতে হবে।
৩.শ্বেতপত্র প্রকাশ:ঋণের প্রকৃত অবস্থা এবং তা পরিশোধের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জাতির সামনে পেশ করতে হবে।
ঋণ নিয়ে ঘি খাওয়ার দিন শেষ।যদি এখনই এই লাগামহীন ঋণের রাশ টানা না যায়, তবে আগামী প্রজন্মকে এক দেউলিয়া রাষ্ট্রের উত্তরাধিকারী হতে হবে।মেগা প্রজেক্টের চাকচিক্য যেন ঋণের কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে না যায়,সেটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.