মাজহারুল ইসলাম।।বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জ) সংসদীয় আসনটি বরাবরই ভোলার মেঘনা আর বরিশালের মাসকাটা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের মতো রাজনৈতিকভাবে অশান্ত।২০০৯ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ ১৭ বছরে মেজবাউদ্দীন ফরহাদ এবং পংকজ নাথের হাত ধরে আসা উন্নয়ন বরাদ্দের খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,অর্থের অংক বাড়লেও জনজীবনে তার প্রভাব ছিল বহুলাংশে প্রশ্নবিদ্ধ। একদিকে বিরোধী দলীয় এমপির “সীমাবদ্ধতার দোহাই”, অন্যদিকে সরকারি দলের এমপির “উন্নয়ন মহোৎসবের আড়ালে দুর্নীতির পাহাড়”—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জের সাধারণ মানুষ।
মেজবাউদ্দীন ফরহাদ: “সীমাবদ্ধতার কান্নায়” কাটানো পাঁচ বছর (২০০৯-২০১৪)
বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য মেজবাউদ্দীন ফরহাদের সময়কালকে হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জের মানুষ “উন্নয়ন খরা” হিসেবেই দেখে।সরকারি দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় তিনি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিলেন ঠিকই,কিন্তু মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
বিমাতা সুলভ আচরণের অজুহাত:
ফরহাদ সাহেব সবসময় বরাদ্দ না পাওয়ার “ভিক্টিম কার্ড” খেলেছেন।বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (ADP) সামান্য ২-৪ কোটি টাকা এবং টিআর-কাবিখার বরাদ্দই ছিল তার সম্বল।কিন্তু প্রশ্ন জাগে,নিজ দলের শাসনামলে যে ভিত্তিপ্রস্তরগুলো স্থাপিত হয়েছিল,তা কেন তিনি বিরোধী দলে থাকাকালে বজায় রাখতে পারলেন না?
নদী ভাঙন রোধে ব্যর্থতা:তার মেয়াদে নদী ভাঙন রোধে কোনো বড় প্রকল্প তো দূরের কথা,নিয়মিত জিও ব্যাগ ফেলানোর কাজেও ছিল হরিলুট।হিজলার বিস্তীর্ণ জনপদ যখন মেঘনায় তলিয়ে যাচ্ছিল,তখন তার “সীমাবদ্ধতার গান” মানুষের ঘর রক্ষা করতে পারেনি।
পংকজ নাথ: “উন্নয়নের জোয়ার” না কি দুর্নীতির মহোৎসব? (২০১৪-২০২৪)
২০১৪ পরবর্তী দশকে পংকজ নাথের আমলে হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জে হাজার কোটি টাকার উন্নয়নের জোয়ার বইছে বলে প্রচার করা হয়।কিন্তু এই ‘মেগা প্রজেক্ট’গুলোর অন্তরালে স্থানীয় পর্যায়ে সিন্ডিকেট ও পেশিশক্তির দাপট উন্নয়নকে সাধারণের দ্বারে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছে।
নদী ভাঙন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’:
মেহেন্দিগঞ্জের ভাঙন রোধে ৭৩৯ কোটি টাকার প্রকল্প বা ইতিপূর্বে ব্যয় হওয়া কয়েকশ কোটি টাকা কি আসলেই কাজে লেগেছে? স্থানীয়দের অভিযোগ ব্লক নির্মাণ ও জিও ব্যাগ স্থাপনে ব্যাপক নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।কোটি কোটি টাকা মেঘনার পেটে গেছে না কি ঠিকাদার আর মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে—তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে গভীর সংশয় রয়েছে।
LGED-র বরাদ্দ ও ‘নিজস্ব বাহিনী’:
এলজিইডির ৫০০ কোটি টাকার বেশি কাজে স্বচ্ছতার চেয়ে দলীয় আনুগত্য বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।রাস্তাঘাট ও কালভার্ট নির্মাণের কাজগুলো নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের বলয়ে বন্দি ছিল।ফলে অনেক সড়ক নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুতায়ন ও আবাসন: চড়া মূল্যের উন্নয়ন:
শতভাগ বিদ্যুতায়নের কৃতিত্ব নেওয়া হলেও লোডশেডিং এবং ট্রান্সফর্মার বাণিজ্যে অতিষ্ঠ ছিল হিজলাবাসী।আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দের ক্ষেত্রেও স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রাজনৈতিক মহলে ওপেন সিক্রেট।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: ফরহাদ বনাম পংকজ—কে কোথায় দাঁড়িয়ে?
তুলনার বিষয়:মেজবাউদ্দীন ফরহাদ (২০০৯-২০১৪), পংকজ নাথ (২০১৪-২০২৪)।
বরাদ্দ প্রাপ্তি:- অত্যন্ত নগণ্য (বিরোধী দল হওয়ার অজুহাতে)।ব্যাপক (হাজার কোটি টাকার উপরে)।
কৌশল:-অনুদান ও ব্যক্তিগত সংযোগ।মেগা প্রজেক্ট ও অবকাঠামো উন্নয়ন।
সমালোচনা:-উন্নয়ন স্থবিরতা ও বরাদ্দের অভাব। দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও দলীয় কোন্দল।
জনমত:-জনবিচ্ছিন্নতা ও দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থান। উন্নয়ন দিলেও একনায়কতান্ত্রিক আচরণের অভিযোগ।
উপসংহার: উন্নয়নের নামে কি পেল সাধারণ মানুষ?
বরিশাল-৪ আসনে মেজবাউদ্দীন ফরহাদ এবং পংকজ নাথ—উভয়েই নিজ নিজ রাজনৈতিক স্বার্থে উন্নয়নকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।ফরহাদ উন্নয়ন করতে না পারার জন্য সরকারকে দোষ দিয়েছেন,আর পংকজ নাথ উন্নয়ন করার নামে নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছেন।
বাস্তবতা হলো,২০২৬ সালে এসেও হিজলা-মেহেন্দিগঞ্জের মানুষ এখনো টেকসই নদী ভাঙন রক্ষা বাঁধ এবং মানসম্মত সড়কের জন্য হাহাকার করছে। হাজার কোটি টাকার বাজেট কেবল কাগজের অংকেই সীমাবদ্ধ থেকেছে,যা কি না এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন আনতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।রাজনৈতিক এই খেলায় কেবল জয়ী হয়েছে দলবাজি,আর পরাজিত হয়েছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.