নিজস্ব প্রতিবেদক।।ভোটের জোয়ারে ক্ষমতায় এলেও বাস্তবতার কঠিন পাথরে হোঁচট খাচ্ছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার।দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র দেড় মাসের মাথায় ব্যাংক খাত থেকে রেকর্ড ৪১,০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে বর্তমান প্রশাসন।মূলত পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া বিশাল ঋণের বোঝা,রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের দেনা মেটাতে গিয়েই এই ‘ধার-দেনার’ অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে দেশ।
**তুলনামূলক চিত্র: উন্নয়ন বনাম পরিচালনা ব্যয়**
আওয়ামী লীগ আমল (২০০৯-২০২৪),বর্তমান পরিস্থিতি (২০২৪-২০২৬)।
**মোট ঋণের স্থিতি** ২ লাখ কোটি (২০০৯) → ১৮.৩৬ ট্রিলিয়ন (২০২৪) | ২১.৪৯ ট্রিলিয়ন (সেপ্টেম্বর ২০২৫)
**ঋণের প্রকৃতি** মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন কেন্দ্রিক।জরুরি ব্যয়,বেতন-ভাতা ও ভর্তুকি কেন্দ্রিক।
**বার্ষিক সর্বোচ্চ ঋণ** ২ ট্রিলিয়ন (গড়) | ৩.২৮ ট্রিলিয়ন (২০২৪-২৫ রেকর্ড)
**অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ**
১. কাঠামোগত দুর্বলতা ও ভঙ্গুর অর্থনীতি**
আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছরে অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন (পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল) করলেও ঋণের যে বিশাল পাহাড় রেখে গেছে, তার কিস্তি পরিশোধ করতেই হিমশিম খাচ্ছে বর্তমান সরকার। বর্তমান ৪১,০০০ কোটি টাকার ঋণের সিংহভাগই যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে (বেতন, জ্বালানি আমদানি)। এটি অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অশনিসংকেত, কারণ এই অর্থ জিডিপিতে কোনো নতুন ভ্যালু যোগ করছে না।
২. ‘জনতুষ্টি’ রাজনীতির চাপ**
তারেক রহমানের সরকার কৃষি ঋণ মওকুফ এবং ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনবান্ধব কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে গিয়ে সরকারকে বিশাল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে,যা মেটানোর একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংক ঋণ। ফলে বেসরকারি খাত ঋণবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বাধাগ্রস্ত করবে।
৩. রাজস্ব আদায়ে চরম ব্যর্থতা**
২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গত ৯ মাসে নির্ধারিত ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া প্রমাণ করে যে, দেশের রাজস্ব প্রশাসন (NBR) পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি ও সংস্কারের অভাবে কর আদায় না বাড়লে সরকার মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট হবে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
ভবিষ্যৎ প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ কোন দিকে?**
* **মুদ্রাস্ফীতির চরম ঝুঁকি:** ব্যাংক থেকে এভাবে লাগামহীন ঋণ নিলে বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বাড়বে,যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।২০২৬-এর শেষে মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
*রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্ভাবনা:**
মানুষ উন্নয়নের চেয়েও ‘স্বস্তি’ চায়। যদি ঋণের টাকায় শুধু প্রশাসন চালানো হয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তবে নতুন সরকারের প্রতি জনমোহভঙ্গ (Disillusionment) দ্রুত ঘটতে পারে।
দাতা সংস্থার কঠোর শর্ত:
অভ্যন্তরীণ ঋণের সীমা অতিক্রম করলে আইএমএফ (IMF) বা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো কঠোর শর্ত আরোপ করবে, যা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের হাত বেঁধে ফেলতে পারে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন একটি ‘ভicious cycle’ বা দুষ্টচক্রের মধ্যে আটকা পড়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের মেগা-প্রকল্পের ঋণের কিস্তি এবং বর্তমান সরকারের পরিচালন ব্যয়ের যোগফল যদি কেবল ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়,তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার দিকে ধাবিত হবে।শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্লোগান নয়,বরং কঠোর আর্থিক সংস্কার ও কর জাল বিস্তারই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.