নিজস্ব প্রতিবেদক।।বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের নাম—আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী একটি দল,যারা রাষ্ট্র গঠনের কারিগর হিসেবে পরিচিত,আজ তারা অস্তিত্বের সংকটে।তবে প্রশ্ন উঠেছে,অপরাধের দায়ে ব্যক্তিদের বিচার নাকি পুরো একটি দলকে ‘নিষিদ্ধ’ বা ‘নির্মূল’ করার চেষ্টা—কোনটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
**অতীতের বিচারিক নজির কী বলে?**
বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভয়াবহ সব রাজনৈতিক অপরাধের বিচার আইনি পথেই হয়েছে।২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা,যা ছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রীকে হত্যার এক জঘন্য প্রচেষ্টা।একইভাবে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার মতো আন্তর্জাতিক চোরাচালানের ঘটনা বা ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের মতো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনাও বিচারিক প্রক্রিয়ায় গড়িয়েছে।
**বিশ্লেষণ:** এই প্রতিটি ঘটনায় শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা বা কর্মকর্তাদের দণ্ড হয়েছে।কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পথে হাঁটেনি রাষ্ট্র।সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়েনি, বরং বিচার বিভাগ তার নিজস্ব গতিতে চলেছে।তবে ২০২৪-২০২৬ পর্বে এসে কেন সেই প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে ‘দল নির্মূল’-এর রাজনীতি সামনে আসছে,তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
**ব্যক্তির দায় বনাম দলীয় দায়বদ্ধতা**
আধুনিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—**”অপরাধ ব্যক্তির, দলের নয়”**। বিশ্বের কোনো উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই ব্যক্তির অপকর্মের জন্য পুরো দলকে বিলুপ্ত করার নজির মেলা ভার।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,যদি কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে, তবে তার বিচার আদালতে হওয়াটাই ন্যায়বিচার।কিন্তু সেই ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে পুরো দলকে কাঠগড়ায় তোলা আইনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।এতে কি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে,নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে?
প্রশাসন কি তবে রাজনৈতিক হাতিয়ার?**
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আরেকটি ভয়াবহ প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—ঢালাওভাবে পুরো প্রশাসনকে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা।সরকার পরিবর্তন হলে কি পুলিশ, প্রশাসন,সেনাবাহিনী বা বিচার বিভাগের সবাই অপরাধী হয়ে যান?
রাষ্ট্রের এই কর্মচারীরা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়,তারা রাষ্ট্রের সেবক।কিন্তু বর্তমান সময়ে বিপুল পরিমাণ মামলা ও গ্রেপ্তারের যে মিছিল দেখা যাচ্ছে,তাতে পুরো রাষ্ট্রীয় কাঠামোই আজ হুমকির মুখে।পুরো প্রশাসনকে যদি অপরাধী হিসেবে দেখা হয়,তবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে কে? এই প্রশাসনিক শূন্যতা কি রাষ্ট্রকে এক গভীর খাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে না?
গণতান্ত্রিক কাঠামো বনাম নিষেধাজ্ঞার সংস্কৃতি**
একটি ঐতিহাসিক রাষ্ট্র নির্মাতা দলকে নিষিদ্ধ করার আলোচনা কি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে যায়? আওয়ামী লীগের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশের সংবিধান এবং রাষ্ট্র সত্তার সঙ্গে তাদের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এখন প্রশ্ন হলো—
* রাজনৈতিক মতভেদ কি আলোচনার মাধ্যমে বা ভোটের মাধ্যমে সমাধান হবে, নাকি নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে?
* আজ যদি একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তবে ভবিষ্যতে অন্য কোনো দল কি একই পরিস্থিতির শিকার হবে না?
প্রতিহিংসা বনাম স্থিতিশীলতা**
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিচার, প্রমাণ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের চেয়ে ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ বড় হয়ে উঠছে বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন।হাজার হাজার মামলা প্রত্যাহার এবং নতুন করে মামলার তালিকা নিয়ে যে লুকোচুরি চলছে,তা রাষ্ট্রের স্বচ্ছতাকে মলিন করছে।
**শেষ কথা:** রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক পক্ষকে ধ্বংস করার মধ্যে নিহিত নয়। বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং নিরপেক্ষ বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমেই সংকট উত্তরণ সম্ভব।রাজনৈতিক সংকট কি আইনি নিষেধাজ্ঞায় মিটবে,নাকি নতুন কোনো সংকটের জন্ম দেবে—সময়ই তার উত্তর দেবে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.