নিজস্ব প্রতিবেদক।। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বরিশাল-ভোলা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে।কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর প্রস্তাবিত দেশের দীর্ঘতম সেতু প্রকল্পের নির্মাণ কাজ শুরুর সম্ভাব্য সময়সূচি শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে সরকার।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল, ২০২৬) জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রাবিউল আলম এই তথ্য জানান।
প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য ও ব্যয়
প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মেগা প্রকল্পটি ভোলা দ্বীপ জেলাকে সরাসরি বরিশাল এবং পটুয়াখালীর মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করবে।প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
মোট দৈর্ঘ্য: ১০ থেকে ১১ কিলোমিটার (পদ্মা সেতুর প্রায় দ্বিগুণ)। এর মধ্যে ৪.৬৮ কিমি মূল সেতু এবং ৪.৯ কিমি এলিভেটেড রোড।
ব্যয়: প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৭,৪৬৬ কোটি টাকা।
নকশা: এটি একটি ‘W’ (ডব্লিউ) আকৃতির সমন্বিত পরিকল্পনা,যা ভোলার ভেদুরিয়া, মেহেন্দিগঞ্জের শ্রীপুর এবং পটুয়াখালীর ধুলিয়াকে সংযুক্ত করবে।
গ্যাস পাইপলাইন: সেতুর নকশায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে স্থানান্তরের জন্য ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের একটি পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমান প্রশাসনিক ও নির্মাণ স্থিতি
সেতুমন্ত্রী জানান,২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই (Feasibility Study) সম্পন্ন হয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পটি অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (CCEA) চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। জাপানিজ প্রতিষ্ঠান (Miyagawa Construction Ltd), দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীন এই প্রকল্পে অর্থায়ন ও নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়ে জানানো হয়েছে যে,প্রায় ১৫০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও ম্যাপ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে।
সরকার ২০৩৩ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
’ডব্লিউ’ (W) নকশার কৌশলগত গুরুত্ব
এই প্রকল্পটি মূলত তিনটি প্রধান পয়েন্টকে সংযুক্ত করছে:
ভেদুরিয়া (ভোলা) – লাহারহাট (বরিশাল): তেঁতুলিয়া নদীর ওপর সংযোগ।
মেহেন্দিগঞ্জ সংযোগ: কালাবদর নদীর ওপর সেতু যা মেহেন্দিগঞ্জকে মূল সড়কের সাথে যুক্ত করবে।
ধুলিয়া সংযোগ: এই গ্রিডের মাধ্যমে পটুয়াখালীর বাউফল ও ধুলিয়া এলাকাকে বরিশালের সাথে যুক্ত করা হবে।
অর্থনৈতিক বিপ্লবের সম্ভাবনা
ভোলা ও বরিশালের প্রায় ৪০ লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি এই সেতুটি দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।ভোলার বিভিন্ন গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক বিপুল পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন এবং সেখানে প্রস্তাবিত শিল্প বাণিজ্য কেন্দ্র, ইপিজেড ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে প্রায় ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পায়রা সমুদ্র বন্দরের সাথেও এই সড়কের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হবে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বরিশালের বঙ্গবন্ধু জাতীয় উদ্যানে (বেল’স পার্ক) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম এই সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সাংবাদিক এম মাজহারুল ইসলামের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে প্রকল্পটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।যদিও করোনা মহামারী এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার ফলে প্রকল্পের কাজ ৪ বছর বিলম্বিত হয়েছে,তবে বর্তমান সরকার এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানিয়েছে,আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে দৃশ্যমান নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.