মাজহারুল ইসলাম।।বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় কালাবদর নদীর ভয়াল ভাঙনে ধীরে ধীরে মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী শ্রীপুর ইউনিয়ন।দীর্ঘদিন ধরে নদী ভাঙন রোধে সরকারের নানা উদ্যোগ,শত শত কোটি টাকার বরাদ্দ এবং উচ্চপর্যায়ের আশ্বাস সত্ত্বেও বাস্তব চিত্রে মিলছে না দৃশ্যমান অগ্রগতি। ফলে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় হাজারো মানুষ।
ভাঙনে বিলীন জনপদ, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হুমকিতে
২০১৫ সালের ৩০ মার্চ ৭টি মৌজা নিয়ে গঠিত শ্রীপুর ইউনিয়নের আয়তন ছিল প্রায় ১৩ বর্গকিলোমিটার।বর্তমানে এর বড় অংশই কালাবদর নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ৫টি ওয়ার্ড আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে—
সহস্রাধিক বসতঘর
২২টি মসজিদ
৩টি মাদ্রাসা
৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়
ঐতিহ্যবাহী শ্রীপুর বাজারসহ শতাধিক স্থাপনা
ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শ্রীপুর মহিষা ওহেদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়,চরফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,শ্রীপুর দারুল উলুম মাদ্রাসাসহ একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।অনেক স্থানে নদী তীর থেকে দূরত্ব নেমে এসেছে মাত্র ২০০ ফুটে।
শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক,কমছে উপস্থিতি
ভাঙনের আতঙ্কে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চরফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা তাহমিমা আক্তার জানান, “৬০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে এখন গড়ে ৪০০ জন উপস্থিত থাকে।”
শ্রীপুর মহিষা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রায় ৯৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে অর্ধেকের মতো এখন স্কুলে আসে।বাকি শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে আসতে চায় না।”
২০১১ থেকে ২০২৪: উদ্যোগ আছে, বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ
সরকার ২০১১ সাল থেকে মেহেন্দিগঞ্জে নদী ভাঙন রোধে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ স্থাপন
উলানিয়া ও শ্রীপুর এলাকায় সিসি ব্লক দিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণ পরিকল্পনা
নদী শাসন, ড্রেজিং ও কারিগরি জরিপ
স্থানীয় ও সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট ৭৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নদী ভাঙন রোধে।
২০১৭ সালে বরিশালের ৫টি উপজেলায় ১১৫০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়,যার মধ্যে মেহেন্দিগঞ্জের জন্য প্রায় ৩৯৬ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছিল।
প্রতিশ্রুতি বহু, কাজ কোথায়?
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কালাবদর-তেতুলিয়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ও নদী শাসনের আশ্বাস দেন।এরপর বিভিন্ন সময় সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক শামীম ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এলাকাটি পরিদর্শন করেন এবং স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, “প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেয়ে কাগজেই বেশি সীমাবদ্ধ।”
৭৩৯ কোটি টাকার প্রকল্পে টেন্ডার বিলম্বে ক্ষোভ
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীপুর রক্ষায় ৭৩৯ কোটি টাকার সি-ব্লক ও বেড়িবাঁধ প্রকল্প অনুমোদন পেলেও দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো টেন্ডার আহ্বান না হওয়ায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত কাজ শুরু না হলে পুরো ইউনিয়নই নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
“শ্রীপুর ইউনিয়ন রক্ষায় সরকার ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে।পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছেন।সি-ব্লক ও রাবার বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
মানববন্ধন ও দাবি অব্যাহত
ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ একাধিকবার মানববন্ধন,স্মারকলিপি ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন।স্থানীয়দের একটাই দাবি—
“প্রতিশ্রুতি নয়,দ্রুত কার্যকর কাজ চাই।”
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.