নিজস্ব প্রতিবেদক।।রাষ্ট্র যখন সাংবিধানিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে,তখন আইনের ভাষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ,তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের সততা।ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং তা ঘিরে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ব্যবহার—এই দুইয়ের সংযোগ আজ একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: আমরা কি সংবিধান অনুসরণ করছি,নাকি সংবিধানের ব্যাখ্যার আড়ালে রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রতিষ্ঠা করছি?
প্রথমেই পরিষ্কার করা জরুরি—১০৬ অনুচ্ছেদ কোনো “বৈধতা প্রদানকারী” ধারা নয়।এটি রাষ্ট্রপতিকে একটি বিশেষ সুযোগ দেয়,যেখানে তিনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চাইতে পারেন। কিন্তু সেই মতামত বাধ্যতামূলক নয়,এটি কেবল পরামর্শ।আদালত এখানে বিচারক নয়,উপদেষ্টা।
অতএব,এই অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে কোনো সরকার “গঠিত” হয়—এমন দাবি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে সরলীকরণ,বরং বলা উচিত—সরকার গঠনের একটি যুক্তি বা ব্যাখ্যা তৈরি করা হয়েছে।
বাস্তবতা হচ্ছে, এই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে রাষ্ট্রপতির প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে।সংবিধানের কোথাও “অন্তর্বর্তী সরকার” নামে কোনো কাঠামো নেই (caretaker ব্যবস্থার বিলুপ্তির পর তো নয়ই)। ফলে এখানে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা একটি সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণের রাজনৈতিক প্রয়াস, যার পেছনে আদালতের মতামত একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই ঢাল কি আইনের,নাকি প্রয়োজনের?
হাইকোর্টে দায়ের করা রিট খারিজ হওয়াকে অনেকেই এই সরকারের “বৈধতা” হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কিন্তু আইনি বাস্তবতা এত সরল নয়।রিট খারিজ মানেই এই নয় যে আদালত বলেছে—“সবকিছু সংবিধানসম্মত”।বরং এর অর্থ হতে পারে আদালত এই বিষয়ে হস্তক্ষেপকে প্রয়োজনীয় মনে করেনি, বা এটি বিচারযোগ্য (justiciable) নয় বলে বিবেচনা করেছে।
অর্থাৎ, বৈধতার সিলমোহর নয়,বরং বিচারিক সংযম (judicial restraint)—এই সিদ্ধান্তের মূল বার্তা।
আরেকটি বিভ্রান্তিকর দিক হলো—এই ১০৬ রেফারেন্সের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ বা নির্দিষ্ট অধ্যাদেশ (যেমন ১৩৩) নিয়ে কোনো দিকনির্দেশনা এসেছে—এমন ধারণা।বাস্তবতা হলো, আদালত কেবল সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়, যা রাষ্ট্রপতি তার কাছে পাঠান।যদি প্রশ্নই না করা হয়, আদালত নিজে থেকে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে না।
এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে—আইনের সীমাবদ্ধতাকে কি সচেতনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে?
এই পুরো প্রক্রিয়াকে অনেকেই “সংবিধানের ভেতরে সমাধান” হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। কিন্তু আরও নির্ভুলভাবে বললে,এটি একটি “constitutional improvisation”—অর্থাৎ সংবিধানের স্পষ্ট কাঠামো না থাকায় একটি পরিস্থিতিগত সমাধান। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়,তবে প্রতিবারই এটি একটি ঝুঁকিপূর্ণ নজির তৈরি করে।
কারণ একবার যদি এই বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয় যে—
“সংবিধানে না থাকলেও, প্রয়োজনে ব্যাখ্যা দিয়ে পথ বের করা যায়”
তাহলে ভবিষ্যতে এই “প্রয়োজন” কে নির্ধারণ করবে?
রাষ্ট্র, আদালত, নাকি ক্ষমতাসীন শক্তি?
সবশেষে বলা যায়, ১০৬ অনুচ্ছেদ এখানে একটি আইনি হাতিয়ার,কিন্তু সেটিকে বৈধতার উৎস হিসেবে দেখানো একটি রাজনৈতিক নির্মাণ।আদালতের মতামত একটি পথ দেখাতে পারে,কিন্তু সেই পথে হাঁটার দায় ও জবাবদিহি সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের।
গণতন্ত্রের মূল শক্তি কেবল প্রতিষ্ঠান নয়, বরং সীমা মানার সংস্কৃতি।সেই সীমা যদি বারবার ব্যাখ্যার নামে প্রসারিত হয়,তবে একসময় সংবিধান আর সুরক্ষা দেয় না—বরং হয়ে ওঠে বিতর্কের অস্ত্র।
এখন প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি সংবিধানকে অনুসরণ করছি,নাকি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সংবিধানকে পুনর্লিখন করছি?
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.