নিজস্ব প্রতিবেদক।।রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে নতুন করে চাঁদাবাজি,হামলা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কয়েকটি চক্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন তাসকিন গাজী নামে এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে ছাত্রদল বা বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় দেন। যদিও তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নেই বলে জানা গেছে। একটি ফোনালাপে তিনি বলেন,“আমি এত বছর রাজনীতি করছি।এখন কি আমি না খেয়ে থাকব?ভাই,আমি এখন শ্রাবণ মাসের পাগলা কুত্তার মতো হয়ে গেছি।মনে করেন আমি পাগল হয়ে গেছি।পাগল হয়ে গেলে সবার কাছ থেকেই ধরতে হয়।”
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শাহবাগকেন্দ্রিক কয়েকটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।তারা আজিজ সুপার মার্কেট,শাহবাগ মেডিসিন মার্কেট, বিপণিবিতান মেডিসিন মার্কেট,পরীবাগ চাঁদ মসজিদ মার্কেট ও পরীবাগ সুপারমার্কেটের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন ও মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায় করছে।
মাসিক ‘রেট’ বেঁধে চাঁদা
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান,দোকানভেদে প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে চাঁদা দিতে হয়,যাকে তারা ‘রেট’ বলে থাকেন।বেশির ভাগ দোকান থেকেই গড়ে ১০ হাজার টাকা মাসিক চাঁদা নেওয়া হয়। কোনো ব্যবসায়ী অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলে তাঁর ক্ষেত্রে চাঁদার পরিমাণ আরও বেশি ধরা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই চাঁদা তোলার সঙ্গে মো. মিথুন (২৮) ও মো. বাইজিদ মোল্লা (২৮) নামের দুই যুবকের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।তাঁরা নিজেদের ছাত্রদলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন এবং ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আক্তার হোসেনের অনুসারী বলে দাবি করেন।
পরীবাগের চাঁদ মসজিদ মার্কেটের ওষুধ ব্যবসায়ী আল-আমিন (রিপন) বলেন,“মিথুন ও বাইজিদ বিভিন্ন সময় চাঁদার দাবিতে হুমকি দিয়েছেন।চাঁদা না পেলে দোকানের কর্মচারীদের মারধরও করেছেন।আমরা ব্যবসা করতে চাই,ঝামেলা চাই না—তাই অনেক কিছু সহ্য করে গেছি।”
চাঁদা না দিলে গুপ্ত হামলা
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,চাঁদা আদায়ের অন্যতম কৌশল হলো গুপ্ত হামলা।কোনো ব্যবসায়ী চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁর দোকানের কর্মচারীকে কৌশলে ডেকে নিয়ে হামলা করা হয় বা তুলে নিয়ে অর্থ আদায় করা হয়।
সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শাহবাগ মেডিসিন কর্নারের কর্মচারী রিয়াজ হোসেনের ওপর হামলা হয়।হামলাকারীরা লোহার রড দিয়ে তাঁকে মারধর করে এবং তাঁর কাছ থেকে ৫২ হাজার টাকা নগদ ও প্রায় ২৫ হাজার টাকা মূল্যের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়।
এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ বাইজিদ মোল্লা,সোহান মোল্লা ও মমিনুল মুনশিকে গ্রেপ্তার করেছে।অন্যদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. তৌফিক হাসান।
আইসিইউর ওষুধ নিয়েও সিন্ডিকেট
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউকে ঘিরেও বড় ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে।সেখানে ৩৯টি শয্যা রয়েছে এবং প্রতিদিন রোগীর জন্য ২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওষুধ লাগে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ,স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ঠিক করে দেন কোন দোকান থেকে আইসিইউতে ওষুধ সরবরাহ করা যাবে।বর্তমানে ৬ থেকে ৯টি দোকানকে এ সুযোগ দেওয়া হয়।এর জন্য সংশ্লিষ্ট দোকানগুলোর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে যুবদলের স্থানীয় নেতা শহীদুল ইসলাম (খোকন) বলেন,“আইসিইউতে ওষুধ দেওয়া নিয়ে আগে ঝামেলা হতো। সবাইকে নিয়ে বসে আমরা বেড ভাগ করে দিয়েছি।যাতে বিশৃঙ্খলা না হয়।”
অভিযোগ অস্বীকার
অভিযোগের বিষয়ে তাসকিন গাজী বলেন,তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং আইসিইউতে নতুনভাবে ওষুধ সরবরাহের ব্যবসা শুরু করেছেন।হামলা বা চাঁদাবাজির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
তবে ব্যবসায়ীদের দাবি,শাহবাগ এলাকায় এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে “বেশি কথা বললে বিপদ আছে”—এই ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না।
প্রশাসনের নজরদারির দাবি
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা-সংশ্লিষ্ট এই এলাকায় ওষুধ ব্যবসাকে ঘিরে চাঁদাবাজি,হামলা ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা জরুরি।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.