মাজহারুল ইসলাম।।রাজনীতির ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে,যেখানে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা নেতারাই নিজেদের নেওয়া সিদ্ধান্তের ভারে শেষ পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়েছেন।বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিসরে শেখ হাসিনার শাসনকালও এমন কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সাক্ষী,যেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগ পরবর্তীকালে নানা বিতর্ক ও সংকটের জন্ম দিয়েছে।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব দেন সাবেক প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে।তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি তখন সরকারের জন্য ইতিবাচক বলে মনে করা হয়েছিল।তবে রাজনীতির বাস্তবতা সব সময় ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে না।নিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান অনেক সময় সরকারের রাজনৈতিক প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।ফলে সেই নিয়োগ পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেই বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
একইভাবে ২০১৫ সালে এস কে সিনহাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্তও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।জ্যেষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তাঁর নিয়োগ দেওয়া হয়।পরবর্তীতে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়কে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।এই সংঘাত দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলে এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়েও নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
২০২৪ সালে সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নিয়োগকে অনেক বিশ্লেষক শেখ হাসিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন।সমালোচকদের মতে,এই সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যক্তিগত আস্থা ও রাজনৈতিক সমীকরণ বড় ভূমিকা রেখেছিল।পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সেনাবাহিনীর অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়,তা দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে।
সবশেষে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞ ও দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের পাশ কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসানোর সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই বিস্ময়কর মনে হয়েছিল।সংকটময় সময়ে তাঁর বক্তব্য ও অবস্থান নিয়েও সমালোচনা দেখা যায়,যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আস্থা ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সব সময় সহজ নয়।ক্ষমতার দীর্ঘ পথচলায় অনেক সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে কৌশলগত বলে মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার ভিন্ন ফলাফল সামনে আসে। শেখ হাসিনার এই কয়েকটি নিয়োগ সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ,যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.