বিশেষ সংবাদদাতা।।বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার কালাবদর নদীতে জেলে হাবীব মাঝির মৃত্যুর ঘটনায় প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ ঘিরে এক সংবাদকর্মীকে কোস্টগার্ড ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অভিযোগ উঠেছে।এ ঘটনায় সাংবাদিক মহলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী,শনিবার (২৪ জানুয়ারি ২০২৬) আছরের নামাজের সময় মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার শ্রীপুর ইউনিয়নে দায়িত্বে থাকা কোস্টগার্ড ক্যাম্পের সদস্যরা যুগান্তর বার্তা নিউজ পোর্টালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক,লেখক-কলামিস্ট এম মাজহারুল ইসলাম-কে খবর দিয়ে ডেকে নেন।
সাংবাদিকের দাবি,তিনি গ্রামের বাড়ির মসজিদে আছরের নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে কোস্টগার্ড সদস্যরা তাকে মোটরসাইকেলে তুলে শ্রীপুরের চরফেনুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপিত অস্থায়ী কোস্টগার্ড ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাকে প্রায় মাগরিব পর্যন্ত আটকে রেখে প্রকাশিত সংবাদের উৎস,তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন,জিজ্ঞাসাবাদের সময় কোস্টগার্ড সদস্যরা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করেন এবং ভিডিও বক্তব্য দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন।একই সঙ্গে সাংবাদিকতার নীতিমালা বহির্ভূতভাবে সংবাদের তথ্যসূত্র জানতে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
সাংবাদিক এম মাজহারুল ইসলাম জানান,তিনি সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ও গণমাধ্যম আইনের আলোকে তথ্যদাতার পরিচয় গোপন রেখে সব প্রশ্নের উত্তর দেন।পাশাপাশি কোস্টগার্ডের চাহিদা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র,তথ্যপ্রমাণ এবং বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের পেপার কাটিংও জমা দেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন,কোস্টগার্ড সদস্যরা প্রশ্ন করেন— স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কেন কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত,কালাবদর নদীতে জেলে হাবীব মাঝির মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের পর থেকেই তাকে হয়রানি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক।তিনি বলেন,নদীতে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এ বিষয়ে এখনো কোনো ইউডি (অপমৃত্যু) মামলা দায়ের হয়নি।বরং সংবাদ প্রকাশের জেরে তাকে অপরাধী বানানোর অপচেষ্টা চলছে।
আইনি বিশ্লেষণ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে,বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কোনো সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬০ ধারা অনুযায়ী,জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনো ব্যক্তিকে তলব করতে হলে লিখিত সমন বা নোটিশ দিতে হয়।মৌখিকভাবে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে ডেকে এনে চাপ প্রয়োগ করা আইনসম্মত নয়।
এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবাদপত্রের স্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার।সাংবাদিকদের তথ্যসূত্র জানাতে বাধ্য করা বা এ বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পরিপন্থী বলে আইনজ্ঞরা মনে করেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিষয়ে ২০২২ সালের নভেম্বরে হাইকোর্টের দেওয়া ৫১ পৃষ্ঠার এক ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়,সংবাদমাধ্যম গণতন্ত্রের “Fearless Watchdog” বা নির্ভীক প্রহরী হিসেবে কাজ করবে।
রায়ে আরও বলা হয়,সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় অযথা হয়রানি বা ভয়ভীতি প্রদর্শন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিপন্থী।একই সঙ্গে আদালত উল্লেখ করেন,কোনো সংবাদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ প্রথমে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করতে পারে।
সাংবাদিক মহলের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় সাংবাদিকরা বলেন,সংবাদের উৎস গোপন রাখা সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি এবং এটি সংবিধানস্বীকৃত অধিকার।কোনো সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিককে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তা পেশাগত স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে।
তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
কোস্টগার্ডের বক্তব্য
এ বিষয়ে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Discover more from jugantorbarta.com
Subscribe to get the latest posts sent to your email.