নিজস্ব প্রতিবেদক।।আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সদ্য অপসারিত চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ সামনে এসেছে।অভিযোগে বলা হয়েছে,তিনি ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা বিচার প্রক্রিয়াকে ‘মামলা-বাণিজ্য’ এবং চাঁদাবাজির হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন।মামলার নামে ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
সিন্ডিকেটের গঠন ও কর্মকাণ্ড
তাজুল ইসলাম ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান।অভিযোগ অনুযায়ী, নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজ ঘনিষ্ঠ ও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারীদের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপরই শুরু হয় ‘মামলা-বাণিজ্য’: মামলা থেকে নাম বাদ বা নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার আশ্বাসের বিনিময়ে ঘুষ নেওয়া।
টার্গেট ছিলেন ব্যবসায়ী,আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হতো বা অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো।
ক্যাশিয়ার তামিম ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
সিন্ডিকেটের অন্যতম ‘মূল ক্যাশিয়ার’ ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিম।অভিযোগ,তিনি নগদ লেনদেনের দায়িত্বে ছিলেন।দুর্নীতির খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদের মাধ্যমে তবে সূত্র বলছে,এটি মূলত অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে,সিন্ডিকেটটি শুধু নগদ অর্থই নয়, সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ঘুষ আদায় করেছিল। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে উল্লেখযোগ্য লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে:
১. প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড (আইবিবি মিরপুর)
অ্যাকাউন্ট নাম: মো. আবুল হোসেন
অ্যাকাউন্ট নং: ৩১৩৩২১৭০০৭৫২৮
জমার তথ্য: ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর ১০ লাখ টাকা, ২৭ নভেম্বর আরও ১০ লাখ টাকা।
২. যমুনা ব্যাংক (মতিঝিল)
অ্যাকাউন্ট নাম: মো. সাইফুল ইসলাম
অ্যাকাউন্ট নং: ১১০১০০৬৬৬৭৬৮৮
জমার তথ্য: ২৭ নভেম্বর ১ লাখ ২৭ হাজার, ১ লাখ ৮৪ হাজার এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।
৩. স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (গুলশান)
অ্যাকাউন্ট নাম: মো. জাহিদ হাসান নয়ন
অ্যাকাউন্ট নং: ১৮৭০২১০১৪০১
অভিযোগ: বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন,এই ব্যাংক লেনদেনগুলো অনুসন্ধান করলে ঘুষের আসল প্রেরক ও গ্রহীতার পরিচয় পাওয়া সম্ভব।
বিদেশ সফর ও অর্থ পাচার
অভিযোগ আছে, ২০২৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে তাজুল ইসলাম ২১ দিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সফর করেন।এ সময় দেশের আদায়কৃত হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ হুন্ডি বা অন্যান্য মাধ্যমে উত্তর আমেরিকায় পাচার করা হয়।
সরকারি পদক্ষেপ
২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকার তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে অপসারণ করে।তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলামকে।
অস্বীকার ও প্রতিক্রিয়া
তাজুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,“গণহত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।” অপর প্রসিকিউটর তামিমও অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।তবে প্রকাশিত ব্যাংক লেনদেন ও ডিপোজিট স্লিপ তাদের অস্বীকারকে চ্যালেঞ্জ করছে।
বিশেষ মন্তব্য
মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন,বিচার ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্থানে যারা নিরপরাধ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আত্মসাৎ করেছে,তাদেরও সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো উচিত।বিএফআইইউ এবং দুদক যদি এই ব্যাংক লেনদেনের সত্যতা যাচাই করে,আইসিটি ট্রাইব্যুনালের পেছনের এই কালো অধ্যায়ের পুরো সত্য দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হবে।
![]()



















































সর্বশেষ সংবাদ :———